পশ্চিমী প্রাচ্যতত্ত্ববিদরা কিছু স্বতঃসিদ্ধ ধারনার
বশবর্তী হয়ে প্রাচ্যের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন যার
প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল ঔপবিবেশিক শিক্ষা নীতি নির্ধারণে। ইংরাজী ভাষার মাধ্যমে
পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তন ভারতের ঐতিহ্যগত দেশীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিকে পঙ্গু
করে দেয়। নগরে, গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মক্তব-মাদ্রাশা-টোল-চতুষ্পাঠীগুলি নতুন
জামানায় দ্রুত সেকেলে হয়ে পড়ে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকরাও হাত
গুটিয়ে নেন যার ফলে সেগুলি কার্যতঃ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম যে
একেবারেই ছিল না তেমনটা নয়। এই রকম একটি ব্যতিক্রমী সংস্কৃত শিক্ষার প্রতিষ্ঠান
ছিল বর্ধমানের ‘বিজয় চতুষ্পাঠী’।
নবদ্বীপ বিদ্বৎসমাজের গৌরব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে রাঢ়,
বিশেষ করে দক্ষিণ রাঢ়ই ছিল বাংলার প্রধান সারস্বত কেন্দ্র। বর্ধমান রাজবংশের বিদ্যোৎসাহিতার
ফলে বর্ধমানকে কেন্দ্র করে অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকেই বহু টোল ও চতুষ্পাঠী স্থাপিত হয়েছিল। উইলিয়াম
অ্যাডামের প্রতিবেদনে বাংলায় ১৮০০ টি সংস্কৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ মেলে যার
মধ্যে বর্ধমান জেলায় ছিল ১৯০টি। এদের অধিকাংশই
ছিল কালনা, আউসগ্রাম, বালকৃষ্ণ, পূর্বস্থলী, রায়না, কাটোয়া, পোতনা ও মঙ্গলকোট থানায়।
সেসময় বর্ধমানের প্রথমসারির সংস্কৃত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন কালিদাস সার্বভৌম,
গুরুচরণ পঞ্চানন, ঈশ্বরচন্দ্র ন্যায়রত্ন, কৃষ্ণমোহন বিদ্যাভূষণ, রঘুনন্দন গোস্বামী
এবং সর্বোপরি প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ যিনি ছিলেন সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের অন্যতম
শিক্ষাগুরু।
তবে ইংরাজী শিক্ষার দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে
সংস্কৃত শিক্ষা ব্যর্থ হয়। ১৮২৪ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার পর সংস্কৃত শিক্ষার একটি অভিন্ন মানদণ্ড গড়ে তোলার
চেষ্টা শুরু হয়। তবে ঐতিহ্যগত টোল-চতুষ্পাঠী কেন্দ্রিক সংস্কৃত শিক্ষার সঙ্গে
সংস্কৃত কলেজ অনুসারী আধুনিক সংস্কৃত শিক্ষার দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। ১৮৯১ সালে বৃটিস
সরকার তৎকালীন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্নকে দায়িত্ব দেন বাংলা, বিহার
ও উড়িষ্যার টোলগুলির উপর একটি সমীক্ষা করতে। মহেশচন্দ্র তাঁর প্রতিবেদনে বর্ধমান
জেলার কয়েকটি উৎকৃষ্ট টোলের উল্লেখ করেন যার মধ্যে অন্যতম ছিল পূর্বস্থলীর কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন
পরিচালিত টোলটি এবং বর্ধমানরাজ তেজচাঁদ প্রতিষ্ঠিত টোলটি। আয়ুর্বেদ চর্চায় এই জেলার মানকরের বিশেষ
প্রসিদ্ধি ছিল। তবে এবিষয়ে সন্দেহ নাই যে উনিশ শতকের শেষ দিকেই সংস্কৃত চর্চা
প্রান্তিক হয়ে পড়ে। কালের চাহিদা অনুযায়ী অনুযায়ী ছাত্রদের অধিকাংশই ইংরাজী
শিক্ষায়তনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এমনকি সংস্কৃত পণ্ডিতদের পরিবারের সন্তানরাও তার
ব্যতিক্রম ছিল না। মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্নের পুত্ররা সকলেই ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত
হন। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর “যুগান্তর’’ উপন্যাসে এই বিষয়টিকে সুন্দরভাবে তুলে
ধরেছেন যেখানে তর্কভূষণ মহাশয় তার বড় ছেলেকে টোলে পাঠাচ্ছেন আর বাকীদের পাঠাচ্ছেন
ইংরাজী শিক্ষায়তনের। শিবনাথ শাস্ত্রী নিজেও ছিলেন একজন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের সন্তান
যদিও তাঁর পিতার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে ডেভিড হেয়ারের স্কুলে ভর্তি করে ভাল ইংরাজী
শেখাবেন। কারন তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে বুছেছিলেন যে ‘ইংরাজীর গন্ধ না হইলে কাজ
কর্ম পাইবার সুবিধা নাই’। তবে হেয়ার স্কুলে ভর্তি না হয়ে তিনি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি
হন যেখানে ইংরাজী শিক্ষাও চালু হয়।
এই পরিস্থিতিতে সংস্কৃত চর্চাকে উৎসাহ দিতে বিজয়চাঁদ মহতাব বর্ধমান রাজপরিবার প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পাঠীটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন ১৮৯৯ সালে (১৩০৬ বঙ্গাব্দে)। তাঁর নামানুসারে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘বিজয় চতুষ্পাঠী’। বর্ধমান শহরে রাজ স্কুলের পিছনে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানটি আজও বিদ্যমান। চতুষ্পাঠীটির তিনটি স্বতন্ত্র বিভাগ ছিল-ন্যায়, স্মৃতি ও বেদান্ত। হরিনাথ বেদান্ততীর্থ (১৮৯৯-১৯২৪), রমেশচন্দ্র বেদান্ততীর্থ (১৯১৪-১৯৩২), মহামহোপাধ্যায় বীরেশ্বর তর্কতীর্থ (১৯১৪-১৯৩২), নৃসিংহ স্মৃতিভূষণ (১৯২৪-১৯৫২), হরেন্দ্রনাথ বেদান্ততীর্থ (১৯৩৩-১৯৫৪), রামহরি স্মৃতিতীর্থ (১৯৪১-১৯৪৫) প্রমূখ অধ্যাপকরা এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান করেছেন। ‘বিজয় চতুষ্পাঠী’তে বেদান্তদর্শন পড়াবার ব্যবস্থা করায় ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা তার তীব্র সমালোচনা করে এই বলে যে, বিজয়চাঁদের মতো একজন আধুনিক ও প্রগতিশীল ভাবধারা পুষ্ট মানুষ প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীর্ণ ও অচল ভারধারা পুনঃপ্রবর্তন করতে চলেছেন।‘বিজয় চতুষ্পাঠী’ ছিল আবাসিক প্রতিষ্ঠান। এর যাবতীয় খরচ বর্ধমান রাজপরিবার বহন করত। ছাত্র-অধ্যাপকদের শুধু পড়াশুনা ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ নয়, প্রায়ই তাঁদের নিমন্ত্রন আসত রাজবাড়ি কিম্বা লক্ষ্মীনারায়ণ জীউ এর মন্দিরে যেখান থেকে তাঁদের পোষাক-আশাক ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করা হত। চতুষ্পাঠীটির নিজস্ব গ্রন্থাগারটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
বর্তমানে আশি জন ছাত্র, তিন জন অধ্যাপক ও একজন অশিক্ষক
কর্মচারী নিয়ে ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠানটি ধুঁকছে লোকচক্ষুর আড়ালে। স্কুল শিক্ষা দপ্তর থেকে নিয়মিত বেতন মিললেও প্রতিষ্ঠানটি
আজ মৃতপ্রায়। বঙ্গীয় সংস্কৃত শিক্ষা পর্ষদ আয়োজিত পরীক্ষা দীর্ঘ দিন বন্ধ। ফলে
ছাত্রদের ভবিষ্যত অন্ধকারে। এখনকার ছাত্রদের অধিকাংশই পৌরহিত্য পেশার জন্যই এখানে
পড়তে আসে। অন্য চাকুরীর দরজা এদের কাছে
কার্যত বন্ধ। চতুষ্পাঠী ভবনটিও দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ। ছাদ থেকে জল
পড়ে গ্রন্থাগারের রক্ষিত বই ও পুঁথিগুলি নষ্ট হতে বসেছে। একই অবস্থা রাজ্যের অন্যান্য সংস্কৃত শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানগুলিরও।
বর্ধমানের এই ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠানটি এবং সেখানে রক্ষিত
বই ও পুঁথিগুলির সংরক্ষণে অবিলম্বে উদ্যোগ
নেওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি রাজ্য সরকার সংস্কৃত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেছে
যা রাজ্যে সংস্কৃত চর্চাকে উৎসাহিত করবে সন্দেহ নাই। টোল-চতুষ্পাঠীগুলিকে মূলধারার
শিক্ষাব্যবস্থার সমান্তরাল ধারা হিসাবে না ভেবে ঐতিহ্যগত শিক্ষার কেন্দ্র হিসাবেও
ভাবা যেতে পারে। তাহলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কালের কবল এড়িয়ে বেঁচে যেতে পারে।
তবে ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যত কর্মসংস্থানের দিকটিও মাথায় রাখতে হবে। বর্তমান
কেন্দ্রীয় সরকারও সম্প্রতি সংস্কৃত শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন রকম প্রকল্প
নিয়েছেন যার সুযোগ নেওয়া যেতে পারে আমাদের এই ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠানগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে।
No comments:
Post a Comment