নদীয়া
জেলার বাহিরগাছি গ্রামে মধুসূদন ভট্টাচার্যের জন্ম। সংস্কৃতচর্চায় বাহিরগাছির ভট্টাচার্য পরিবারের বিশেষ সুনাম ছিল। মধুসূদন
ভট্টাচার্যের পিতামহ ছিলেন রঘুমণি বিদ্যালঙ্কার যিনি হেনরী কোলব্রুকের অনুরোধে
“শব্দমুক্তামহার্ণব” (১৮০৭) নামে একটি অভিধান সংকলন করেন। তাঁর পিতা শ্রীকান্ত তর্কালঙ্কারও
ছিলেন প্রথিতযশা পণ্ডিত। মধুসূদনের শিক্ষারম্ভ তাঁর পিতার কাছেই। পরে বেনারসে উচ্চ শিক্ষা লাভ। সেখান
থেকেই সম্ভবত তিনি ‘তর্কপঞ্চানন’ উপাধি লাভ করেন। বেনারস থেকে ফিরে তিনি গ্রামে
নিজের চতুষ্পাঠী খোলেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা অনেকেই
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। বর্ধমানের মহারাজা মহতাব চাঁদের
আহ্বানে মধুসূদন বর্ধমান রাজসভার পণ্ডিত হিসাবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর
পৃষ্ঠপোষক মহতাব চাঁদের কীর্তিকাহিনী বর্ণনা করে “মহারাজাধিরাজ চরিতম্” (১৮৭৬)
রচনা করেন। আদ্যান্ত ঐতিহ্যগত শিক্ষায় শিক্ষিত এই মধুসূদন তর্কপঞ্চাননের সঙ্গে কালক্রমে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এক গভীর
বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মধুসূদন বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনে সক্রিয়
ভাবে সামিল হন।
সেই সময়ের
এই দুই দিকপাল পণ্ডিতের সম্পর্কের রসায়নটি ছিল বেশ অদ্ভুত। দুজনের সামাজিক
অবস্থান, শিক্ষাদীক্ষা ও ভাবনাচিন্তার মধ্যে বৈপরীত্য ছিল চোখে পড়ার মত। একজন
ঐতিহ্যগত শিক্ষায় শিক্ষিত মফস্বলের রাজসভাপণ্ডিত অন্যজন নগরকেন্দ্রিক কলেজ শিক্ষিত
সংস্কারপন্থী পণ্ডিত। বিদ্যাসাগর এমন এক সংস্কৃত শিক্ষার কথা ভাবতেন যা পাশ্চাত্য
জ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে চলবে। পাশাপাশি তিনি বাংলা ভাষা শিক্ষার উন্নয়নেও বদ্ধপরিকর
ছিলেন। অন্য দিকে মধুসূদনের সমগ্র জগত জুড়ে ছিল সংস্কৃত। তিনি বাংলা ভাষায় লিখতে
পছন্দ করতেন না। তাঁর সমস্ত লেখাপত্রই সংস্কৃত ভাষায় লেখা। মহতাব চাঁদের উদ্যোগে বর্ধমান
থেকে যে দুই খন্ডের “প্রশ্নোত্তরমালা” গ্রন্থ প্রকাশিত হয় (১৮৭৩/৭৯) সেখানে অন্যান্য পণ্ডিতরা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর বাংলায়
দিলেও মধুসূদন কেবলমাত্র সংস্কৃত ভাষাতেই উত্তর দেন। মধুসূদন ছিলেন সেই বিরল গোষ্ঠির
পণ্ডিতদের একজন যাঁরা সংস্কৃত ভাষাকে একান্তভাবে আঁকড়ে ছিলেন যখন ইংরাজী এবং বাংলা
শিক্ষা বাংলাদেশে শিক্ষার ধরণটিকে অমূল বদলে দিচ্ছিল। সুকুমার সেনের মতে এক্ষেত্রে
তাঁর সঙ্গে মিল ছিল বর্ধমানের আর এক দিকপাল পণ্ডিতের। তিনি ছি্লেন সংস্কৃত কলেজের অলঙ্কারের
অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ। মধুসূদন তাঁর সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ “বামনাখ্যানম্”
(১৮৭৩) এর প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেন যে তাঁর বন্ধুরা অনেকে এর বঙ্গানুবাদ করতে
তাঁকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বাংলায় লেখা তাঁর অভ্যাস নাই। তাই তিনি তাঁর বন্ধু
বিদ্যাসাগরকে অনুরোধ করেন ওই কাজটি করার জন্য। বিদ্যাসাগরও সেই
বন্ধুকৃত্য করতে পিছপা হননি যা তাঁদের গভীর বন্ধুত্বের সাক্ষ্য বহন করে। মধুসূদন যেমন
বিদ্যাসাগরের কলকাতার বাড়িতে যেতেন তেমনি বিদ্যাসাগরও মাঝে মধ্যে কলকাতার নাগরিক
জীবনের চাপ কাটাতে বাহিরগাছায় চলে যেতেন। শোনা যায় একবার মধুসূদনের আকস্মিক অসুস্থতার কারনে তাঁদের বাহিরগাছার
বাড়িতে অষ্টমীর পুজো সম্পন্ন করেন বিদ্যাসাগর। সংস্কৃত চর্চার প্রতি একাগ্র আনুরাগ
সত্ত্বেও মধুসূদন তর্কপঞ্চানন বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার আন্দোলনের প্রতি
আকৃষ্ট হন এবং তার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত হন।
আপাতদৃষ্টিতে
এই দুই পণ্ডিতের বন্ধুত্ব কিছুটা বেমানান লাগলেও বিষয়টা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল
না। কলকাতা ও কলকাতা কেন্দ্রিক বিদ্যাচর্চার সঙ্গে বাহিরগাছার ভট্টাচার্য পরিবারের
যোগাযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। মধুসূদনের পিতামহ রঘুমণি বিদ্যালঙ্কারের উত্তর কলকাতার
চিৎপুর রোডে একটি চতুষ্পাঠী ছিল। প্রখ্যাত প্রাচ্যতত্ববিদ হেনরী কোলব্রুকের সঙ্গে
তাঁর ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। পারিবারিক উদার পরিমণ্ডল ছাড়াও
মধুসূদনের সঙ্গে কলকাতার তৎকালীন সামাজসংস্কার আন্দোলনের যোগাযোগ গড়ে ওঠার পিছনে
অন্যতম অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলেন খুব সম্ভবত তাঁর পৃষ্ঠপোষক মহতাব চাঁদ।
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মহতাব চাঁদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
মহতাব চাঁদ ছিলেন বিদ্যাসাগরের সংস্কার প্রচেষ্টার সমর্থক এবং সেই কারণে
বিদ্যাসাগর প্রায়শঃই বর্ধমানে আসতেন তাঁর সাহায্য নিতে। মধুসূদন তাঁর পৃষ্ঠপোষকের
দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে থাকতে পারেন।
মধুসূদন
তর্কপঞ্চানন বিধবা বিবাহের সমর্থক ছিলেন। ১৮৫৩ সালে কলকাতায় শ্যামাচরণ দাস সংস্কৃতজ্ঞ
পণ্ডিতদের আহ্বান জানান বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত কিনা সে নিয়ে তাঁদের মতামত
জানাতে। মধুসূদন বিধবা বিবাহের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগরের
নেতৃত্বে বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলনে এবং বিধবা বিবাহ সম্পাদনে তাকে সহযোগীর
ভূমিকায় দেখা যায়। তবে সব ক্ষেত্রে যে তিনি বিদ্যাসাগরের মত মেনে নিয়েছিলেন এমনটা
নয়। বহু বিবাহ প্রথা নিয়ে বিদ্যাসাগরের
অবস্থান তিনি সমর্থন করেননি। সেক্ষেত্রে বর্ধমানের আর এক প্রথিতযশা
পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচষ্পতির সঙ্গে তাঁর অবস্থান কিছুটা মিলে যায়। অম্বিকা কালনার
তারানাথ তর্কবাচষ্পতি বিদ্যাসাগরের থেকে বয়সে কিছুটা বড় হলেও তিনি ছিলেন সংস্কৃত
কলেজে বিদ্যাসাগরের সহপাঠী এবং পরবর্তী কালে তাঁর সহকর্মী ছিলেন। স্ত্রী শিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলনে
তারানাথ বিদ্যাসাগরের পক্ষে এসে দাঁড়ালেও বহু বিবাহ বিরোধী আন্দোলনে তিনি
বিদ্যাসাগরের তীব্র সমালোচক ছিলেন। তবে পার্থক্য হল এই যে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে
তারানাথের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি পরবর্তীকালে যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় মধুসূদনের
সঙ্গে তেমনটা ঘটেনি। এর থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে সেই যুগের সংস্কৃতজ্ঞ
পণ্ডিতরা আর যাই হোন সকলেই একই ছাঁচে ঢালা ছিলেন না। পরিবর্তনপন্থী বা
পরিবর্তনবিরোধী এমন সরল সমীকরণের সাহায্যে ও তাঁদের বোঝা যাবে না। তাঁরা কোন কাল্পনিক
জগতের বাসিন্দাও ছিলেন না, ছিলেন বাস্তবের রক্তমাংসের মানুষ। সমসাময়িক সামাজিক
বিতর্কে তাঁদের অবস্থান নির্ধারণে বিদ্যাচর্চার পাশাপাশি ব্যক্তিস্বার্থ, ব্যক্তিগত
পছন্দ-অপছন্দ, ঈর্ষা, আত্মগরিমা এসবের ভূমিকাও কম ছিল না।
No comments:
Post a Comment