Thursday, 1 March 2018

ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রামাণ্য আখ্যান রচনা করলেন বর্ধমানের এক ভূমিপুত্র, বদরুদ্দীন উমর





একুশে ফেব্রুয়ারী দিনটি দুই বাংলার মানুষের কাছেই ভীষণ প্রাসঙ্গিক, ছয় দশক পরেও। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর মানচিত্রে ১৯৭১ সালে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভোম রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে শরৎচন্দ্র বসু, সুরাবর্দী, আবুল হাসিমরা যে স্বাধীন বাংলার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন তা যে অলীক কল্পনা ছিল না বাংলাদেশের জন্ম আমাদের সেই কথা মনে করিয়ে দেয়। দেশভাগকে মেনে নিয়ে এপার বাংলার বাঙালিরা সেই স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় সন্দেহ নাই। তবে ওপার বাংলার ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হতে আমাদের কোন বাধা নাই যখন দেখি ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রামাণ্য আখ্যন রচনা করেন বর্ধমানেরই এক ভূমিপুত্র, বদরুদ্দীন উমর। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর তিন খন্ডে  রচিত অসংখ্য সাক্ষাৎকার ও দলিল সম্বলিত পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১৯৭০) গ্রন্থটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস চর্চায় একটি প্রাথমিক ও অপরিহার্য গ্রন্থ। বিগত শতাব্দীর একজন অগ্রগণ্য ইতিহাসচিন্তাবিদ ইতিহাসের ছাত্রদের উপদেশ দিয়েছিলেন ইতিহাসকে বুঝতে হলে ঐতিহাসিককে জানা প্রয়োজন এবং তার জন্য প্রয়োজন তাঁর সময়কে জানা। তাই ভাষা আন্দোলনের এই আখ্যানকার কোন পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছিলেন তা জেনে নেওয়া দরকার।

বর্ধমানের একটি অত্যন্ত  সম্ভ্রান্ত, রাজনীতিমনস্ক পরিবারে বদরুদ্দীন উমরের (১৯৩১-) জন্ম। পিতা আবুল হাসিম ছিল অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের একজন প্রথমসারির নেতা। অসাম্প্রদায়িক, চিন্তাশীল, ইসলামীয় সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষটি মুসলিম লীগে কিছুটা একলা হয়ে পড়েছিলেন শেষের দিকে। বাংলা ভাগ হোক এটা তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। বস্তুতপক্ষে  অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার ধারণাটি ছিল তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁর নিকট আত্মীয়দের অনেকেই কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই রকম একটি রাজনৈতিক পরিবেশে বদরুদ্দীন উমরের বড় হয়ে ওঠা। পড়াশোনা বর্ধমান টাউন স্কুলে এবং পরে বর্ধমান রাজ কলেজে। দেশভাগের পর বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেলেও তাঁর পিতা আবুল হাসিম সেই পথে পা বাড়াননি। তবে ১৯৫০ সালে তাঁদের বর্ধমানের বাড়িতে একদল দুষ্কৃতী আগুন লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনায় তাঁর বাবা বিশেষভাবে ভেঙে পড়েন এবং দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। বদরুদ্দীনের বয়স তখন আঠারো। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন দর্শন নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তখন ভাষা আন্দোলনে উত্তাল। তবে সেই আন্দোলনে তিনি যুক্ত হননি। ১৯৫৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৫৯-৬১ সালে তিনি অক্সফোর্ডে পড়তে যান যা ছিল তখন মার্কসীয় ইতিহাস চর্চার অন্যতম কেন্দ্র ইতিহাসের ছাত্র না হলেও তিনি যে ঐ জ্ঞানচর্চার পরিমন্ডলে প্রভাবিত হয়েছিলেন এ নিয়ে সন্দেহ নাই। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টির একজন প্রথম সারির নেতা নেপাল নাগের, যাঁর উদ্যোগে তিনি দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকে তাঁর সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৮)সংস্কৃতির সংকট (১৯৬৮) নামে দুটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হয় যার ফলে তিনি রাজরোষের শিকার হন। এর ফলে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরী ছেড়ে দিয়ে সক্রিয় বামপন্থী রাজনীতিতে যোগ দেন।

ষাটের দশকের শুরু থেকেই তিনি ভাষা আন্দোলনের একটি তথ্য নির্ভর ইতিহাস লেখার ভাবনা শুরু করেন। ঐ আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশ না নেবার ফলে তিনি অনেকটা নির্মোহ অবস্থান নিতে পেরেছিলেন আন্দোলনের ইতিহাস রচনা কালে। ভাষা আন্দোলনকে তিনি নিছক একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসাবে দেখতে রাজী ছিলেন না। ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ববাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোটিকে তিনি বোঝার চেষ্টা করেন। পূর্ববাংলায় তিনি ছিলেন নবাগত। সে কারনে তিনি এই কালপর্বটিকে বোঝার জন্য বহু মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করেন। প্রথম সাক্ষাৎকারটি নেন কামরুদ্দীন আহমেদের। এর পর শতাধিক মানুষের সাক্ষাৎকার তিনি নেন যেগুলির নির্বাচিত অংশ পরে ঢাকা বাংলা একাডেমী থেকে দুখণ্ডে প্রকাশিত হয় ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গঃ কতিপয় দলিল  (১৯৮৪, ১৯৮৫) নামে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বেশকিছু বিভ্রান্তি শুরু থেকেই ছিল এবং এখনও আছে। ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দাবিদারের সংখ্যা যে ক্রমশঃ বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। বিভ্রান্তি আছে আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি নিয়েও। সচরাচর এই আন্দোলনকে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আন্দোলন হিসাবেই দেখা হয়ে থাকে, সাধারন মানুষের ভূমিকা সেখানে নাটকের মৃত সৈনিকের মত। সম্প্রতি বাংলাদেশের কিছু ঐতিহাসিক এই প্রশ্নটি নতুন করে তুলেছেন। কেন অগণিত সাধারণ মানুষ যাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন স্কুলের চৌহদ্দিতেই পা রাখেনি এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল? যখন পূর্ববাংলার জনসংখ্যার ৮৫% মানুষি ছিন নিরক্ষর তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু হবে তার সঙ্গে এদের প্রত্যক্ষ যোগ পাওয়া মুসকিল। এমনকি ভাষা শহীদদের মধ্যে কেবলমাত্র আবুল বরকত ছাড়া কেউই সেই অর্থে ছাত্র ছিল না। এই বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসার দিকনির্দেশ বদরুদ্দীন উমর ১৯৭০ সালেই তাঁর লেখায় দিয়েছেন। তিনি ভাষা আন্দোলনকে একটি বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হিসাবে দেখেননি। তাঁর বিশ্লেষনে ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ববাংলার ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংঘাতেরই বহিঃপ্রকাশ। বদরুদ্দীন উমর দেখিয়েছেন যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলি ১৯৫২ সালের ভাষা বিতর্কের সঙ্গে মিলে যার যার পরিণতিতেই ভাষা আন্দোলন একটি গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এই মিলন ঠিক কিভাবে ঘটেছিল তা নিয়ে নতুন করে চর্চা করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। বদরুদ্দীন উমর যেখানে শেষ করেছেন সেখান থেকেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে নতুন ধরণের চর্চা শুরু হতে পারে।

পূর্ব পাকিস্তান সরকারের খাদ্য নীতি, কৃষি পণ্যের মূল্য, আমলা ও পুলিসের আচার-আচরণ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিল উর্দ্ধমুখী। ১৯৪৭ সালের পর খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের কর্ডন ও লেভি নীতি কৃষকদের জীবন দুর্বিসহ করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পুলিস ও আমলাতন্ত্রের অত্যাচার। পুলিসি অত্যাচার কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছে ছিল তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে এই হিসাব থেকে। শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার অছিলায় পুলিস জনতার উপর গুলি চালায় ১৯৪৮ সাল ৩৮ বার। ১৯৪৯, ৫০ এবং ৫১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯০ বার, ১১০ বার এবং ৫০ বার। এই সময়কালে অসংখ্য বার পুলিস জনতার সংঘাতের দৃষ্টান্ত মেলে সরকারী নথিতে। স্বাভাবিক ভাবেই জনগনের কাছে পুলিস তার বৈধতা হারিয়েছিল। অন্য দিকে ১৯৫২ সালের প্রথম থেকেই পাটের দাম যেমন পড়তে থাকে তেমনি চালের দাম বাড়তে থাকে আগের বছরের মতই। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের  অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের ভাষা বিতর্ককে কেন্দ্র করে এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষেরই বিষ্ফোরণ ঘটে। এই অসন্তোষের অভিমুখকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করতে পূর্ববাংলার আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট নেতা কর্মীদের ভূমিকাও ছিল অনস্বীকার্য, আন্দোলনের ধরণ থেকেও যা পরিষ্কার। ভাষা আন্দোলনের সরকারী ইতিহাসে এদের ভূমিকা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তাই ভাষা দিবস উদ্‌যাপনের দিনে ভাষা আন্দোলনের এই আখ্যানকারকেও স্মরণ করা প্রয়োজন যাঁর শিকড় ছিল বর্ধমানের মাটিতে প্রথিতসেই শিকড়ের টানেই তিনি প্রায় নিয়মিত বর্ধমানে আসেন। বেশ কিছু কাল আগে তাঁর সাক্ষাৎকার নেবার সুযোগ হয়েছিল। বর্ধমানের কথা উঠতেই তিনি আবেগ আপ্লুত স্বরে বলে উঠেন, ‘বর্ধমানে এলে একধরনের ঘরে ফেরার অনুভূতি হয়’। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেও আঠারো বছর বয়েসে ছেড়ে যাওয়া বর্ধমান শহরকে তিনি ভুলতে পারেননি। মনে প্রাণে এখনও তিনি বর্ধমানের মানুষই থেকে গেছেন।

No comments:

Post a Comment

উচ্চশিক্ষায় টি-টোয়েন্টিসুলভ তাণ্ডবলীলা

সম্প্রতি জেলার ও রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অকৃতকার্যতার অস্বাভাবিক হার বৃদ্ধি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের মাথাব্...