Tuesday, 13 March 2018

ডিভিসি ও বন্যা নিয়ন্ত্রন


কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া বন্যা আমাদের ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। ’৭৮ সালের পর আরও বেশ কয়েকটি বড় বন্যা দক্ষিণ বঙ্গের এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করেছিল প্রবল বৃষ্টির পাশাপাশি ডিভিসির জলাধারগুলি থেকে ক্রমাগত জল ছাড়া বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে নিয়ে প্রতিটি বড় বন্যার সময় রাজ্য সরকার ও ডিভিসি কর্ত্তৃপক্ষের মধ্যে চাপান উৎরান সংবাদপত্র ও বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের কল্যানে আমাদের সকলের জানা বিগত বন্যার সময়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। স্বাভাবিকভাবেই বন্যা নিয়ন্ত্রনে ডিভিসির ভূমিকা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরী হয়েছে জনমনে। এই লেখার উৎস সেখান থেকেই।

দামোদর নদের বন্যা কোন নতুন ব্যাপার নয়। দামোদর উপত্যকার মানুষ এই ‘দুঃখের নদী’র সঙ্গে ঘর করেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই। নদীর বন্যা যেমন মাঝে মধ্যে তাদের সর্বস্ব গ্রাস করত তেমনি ফসলে, সম্পদে ভরিয়ে দিতেও কার্পণ্য করত না। সে কারনেই মানুষ যুগ যুগ ধরে নদীকে পূজো করে। একই সঙ্গে মানুষ নদীকে নিয়ন্ত্রণ ও করেছে সাধ্যমত। তবে নদীকে নিয়ন্ত্রন করা আর তাকে দমন করার মধ্যে পার্থক্য আছে। মহাকাব্যে ও পুরাণে ভগীরথের উপাখ্যান বোধহয় সেই ইঙ্গিতই করে।
উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই বৃটিস প্রযুক্তিবিদরা দামোদরের বন্যা নিয়ন্ত্রণে উচ্চ অববাহিকায় জলাধার নির্মানের সুপারিশ করেছিলেন। তবে বিভিন্ন কারনে এই পরিকল্পনা রূপায়িত হয়নি। কিন্তু  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটময় কালে ১৯৪৩ এর বন্যা বৃটিশ সরকারকে বাধ্য করে এনিয়ে নতুন করে ভাবনা চিন্তা করতে। এরই ফলশ্রুতিস্বরূপ দামোদরের বন্যা নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার Tennessee Valley Authority (TVA) র মডেল অনুসরণ করে দামোদর উপত্যকার সার্বিক উন্নয়নের একটি খসড়া প্রকল্প তৈরী করা হয় যার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দামোদরের বন্যা নিয়ন্ত্রন। এই খসড়া প্রকল্পটি তৈরী করেন TVA  এর একজন বরিষ্ঠ প্রযুক্তিবিদ, W. L. Voorduin তিনি দামোদরের উচ্চ অববাহিকায় সাতটি জলাধার নির্মানের কথা বলেন যার মাধ্যমে নিম্ন দামোদর অববাহিকায় আসা দামোদরের জলকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। এছাড়াও ভূমিক্ষয় রোধ, জলপথ পরিবহন, পানীয় ও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করা যাবে জলাধারগুলি থেকে। ১৯৪৮ সালের ২৭শে মার্চ “দামোদর ভ্যালী কর্পোরেশন আইন, ১৯৪৮” বিধিবদ্ধ হয়।

এই আইনের ১২ নং ধারায় বলা হয় যে ডিভিসি নিম্নলিখিত ছয়টি কাজে উদ্যোগী হবে। সেগুলি হল
·        জলসেচ ও জল সরবরাহ
·        বিদ্যুৎ (জলবিদ্যুৎ ও তাপ বিদ্যুৎ) উৎপাদন ও বন্টন
·        দামোদর ও তার শাখানদীগুলির বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও হুগলি নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি
·        দামোদর ও তার শাখানদীগুলিতে নৌপরিবহন
·        বৃক্ষরোপণ ও ভূমিক্ষয় রোধ
·        জনস্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এবং সামগ্রিকভাবে দামোদর অববাহিকার উন্নয়ন।

লক্ষ্যনীয় এই যে বন্যা নিয়ন্ত্রন  অগ্রাধিকারের নিরীক্ষে তৃতীয় স্থান পায়। আইনের ১৩ থেকে ২০ নং ধারায় জলসেচ, জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্টন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকলেও বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি কথাও সেখানে উল্লেখ নাই।

দামোদর উপত্যকায় বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পটি রূপায়নেও বেশ কিছু বিচ্যুতি ঘটে। প্রকল্পে  প্রস্তাবিত সাতটি জলাধারের পরিবর্তে চারটি মাত্র জলাধার নির্মান করা হয় তিলাইয়া, মাইথন, পাঞ্চেত এবং কোনারে যাদের সম্মিলিত জলধারণ ক্ষমতা প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাত্র ৫৫%পরবর্তী কালে বিহার (অধুনা ঝাড়খণ্ড) সরকার তেনুঘাটে আর একটি জলাধার নির্মান করে ১৯৭৪ সালে যা ডিভিসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু ডিভিসি  আর নতুন কোন জলাধার নির্মান করতে পারেনি। ইতিমধ্যে পুরোন জলাধারগুলির জলধারণ ক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে পঞ্চাশ বছর পার করে। ফলে কার্যকর বন্যা নিয়ন্ত্রণ যে ডিভিসির পক্ষে আর সম্ভব নয় তা পরিষ্কার। শুধু তাই নয় বন্যা নিয়ন্ত্রনে ডিভিসি কতটা বদ্ধপরিকর সে নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ আছে।

এনিয়ে সন্দেহ নাই যে ডিভিসি একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প এবং ডিভিসি তার বন্যা নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্য থেকে বহু যোজন দূরে সরে গেছে। ডিভিসির বিগত কয়েক বছরের বাৎসরিক প্রতিবেদনগুলির উপর নজর দিলেই এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্টনই হল এখন ডিভিসির মুখ্য উদ্দেশ্যপশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির বিদ্যুতের চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ করে ডিভিসি। ডিভিসি প্রকল্প পুরোপুরি রূপায়িত হলে কী হত তা কল্পনা সাপেক্ষ। তবে প্রকল্পটির মধ্যেও কিছু স্ববিরোধিতা ছিল সে নিয়ে সন্দেহ নাই। বন্যা নিয়ন্ত্রন ও জলসেচ একে অপরের পরিপূরক হলেও একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রন ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন পরস্পর বিরোধী ধারণা। জলাধারগুলিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের অনুকূল করতে হলে বর্ষার আগে সেগুলি খালি রাখা জরুরী যাতে বর্ষার জল ধরে রাখা যায়কিন্তু জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে জলাধার খালি রাখা সম্ভব নয়। এছাড়াও রবি মরসুমে চাষের জল সরবরাহের জন্যও জলাধারে জল ধরে রাখা হয়। তাই অতিবর্ষণের সময় বাড়তি জল ধরে রাখা সম্ভব হয় না জলাধারগুলির পক্ষে। ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যত শিকেয় ওঠে শুধু তাই নয় বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে জলাধার থেকে বাড়তি জল ছাড়ার ফলে। এই পরিস্থিতিতে ডিভিসি যে ভূমিকাটি পালন করে তা বন্যা নিয়ন্ত্রকের নয়, বন্যা ব্যবস্থাপকের। বহুমুখী নদী প্রকল্পের যেমন সুবিধা আছে তেমনি আর অসুবিধেগুলিও যে কম নয়, ডিভিসি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

একটি বিষয় ডিভিসি কর্তৃপক্ষ এবং বিশেষজ্ঞরা ভেবে দেখতে পারেন, তা হল’ ডিভিসির জলাধারগুলিকে কেবলমাত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হোক, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়। ডিভিসির মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের কমবেশী মাত্র দুই শতাংশ (১৫০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি) আসে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি থেকে যে ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে আর একটি নতুন তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরী করে। একমাত্র  অনাবৃষ্টির বছর সেচের জলে ঘাটতি দেখা দিতে পারেতা না হলে প্রায় সারা বছর দামোদর ও ডিভিসির ক্যানেলগুলিতে জলের সরবরাহ অব্যাহত থাকবে আশা করা যায়। বন্যাজনিত প্রাণ ও সম্পদহানির হিসাব মাথায় রাখলে ১৫০-২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরীর খরচ খুব বেশী হবে বলে মনে হয়না। বাড়তি পাওনা হবে বর্ষা ছাড়া বছরের অন্য সময় দামোদরের মরা খাতে জলের দেখা মেলা যার পরিবেশগত মূল্য অসীমদামোদর ও তার শাখা নদীগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আমরা নদীগুলিকে কার্যত মেরে ফেলতে চলেছি যা কোন অজুহাতেই সমর্থনযোগ্য নয়।

No comments:

Post a Comment

উচ্চশিক্ষায় টি-টোয়েন্টিসুলভ তাণ্ডবলীলা

সম্প্রতি জেলার ও রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অকৃতকার্যতার অস্বাভাবিক হার বৃদ্ধি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের মাথাব্...