বর্ধমান
শহরের কোর্ট চত্ত্বরে অবস্থিত ‘জেলা মহাফেজখানাটি’ বহু মূল্যবান নথিপত্রের এক
অমূল্য ভান্ডার। জেলার মহাফেজখানাগুলি সচরাচর এরাজ্যের গবেষকরা বিশেষ ব্যবহার
করেননা। তাঁদের নজরে থাকে মূলতঃ কলকাতায় অবস্থিত স্টেট আর্কাইভস্ কিম্বা দিল্লির নাশানাল
আর্কাইভস্। তবে আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় জেলা
স্তরের সরকারী মহাফেজখানাগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। নব্বই এর দশকের শুরু
থেকেই বর্ধমানের আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। শুরুটা হয় অপেশাদার
নাগরিক ঐতিহাসিকদের হাত ধরেই। তবে পরে ইতিহাসের ছাত্র গবেষকরাও বর্ধমানের আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় মনোনিবেশ করেন। এর সূত্র ধরেই নব্বই এর শেষের দিকে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইতিহাস বিভাগের পক্ষ থেকে জেলা মহাফেজখানার নথিপত্রের একটি তালিকা প্রস্তুত করার
উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তা বেশীদূর এগোয়নি। সম্প্রতি এই ধরণের আর একটি উদ্যোগ
নেওয়া হয় যাতে আমার সঙ্গী হন আমার এক তরুণ গবেষণা সহায়ক, শ্রী অয়ন কুণ্ডু এবং বর্ধমানের
এক বিশিষ্ট গবেষক ড. সর্বজিৎ যশ।
জেলা
মহাফেজখানার সবচেয়ে পুরোন নথিগুলির মধ্যে অন্যতম হল ১৭৮৮ সাল থেকে বর্ধমান
কালেক্টরেট থেকে প্রেরিত ও কালেক্টরেটে আগত সরকারী চিঠিপত্রের সংগ্রহ। ১৯৫৫-৫৬
সালে অশোক মিত্রের সম্পাদনায় এই চিঠিগুলির একাংশের অনুলিপি দু’খণ্ডে মুদ্রিত
হয় West Bengal District Records (New Series): Burdwan: Letters
Received, 1788-1802 (1955) এবং West Bengal District Records (New
Series): Burdwan: Letters Issued, 1788-1800 (1956) নামে। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এটি
ছিল একটি সাধু উদ্যোগ। তবে পরবর্তীকালে ঐ চিঠিগুলির দীর্ধমেয়াদী সংরক্ষণের কোন
উদ্যোগ নেওয়া হয়নি প্রশাসনের পক্ষ থেকে। ইতিমধ্যেই কালের গ্রাসে বেশকিছু চিঠি নষ্ট
হয়ে গেছে। যেগুলি আছে সেগুলির অবিলম্বে সংরক্ষণ প্রয়োজন। ১৭৮৮ থেকে ১৮৬৫ সময়পর্বে এই ধরণের হাতে লেখা চিঠির ১৩৭৮ টি বাঁধানো খণ্ড
পাওয়া গেছে (আনুমানিক ১৯৫৬৮ পৃষ্ঠা)। চিঠিপত্রের পাশাপাশি জেলা মহাফেজখানায়
রক্ষিত আছে হাজারের উপর হাতে আঁকা ( কাগজে আঁকা ও কাপড়ের উপর সাঁটানো) মৌজা ও
পরগনার মানচিত্র যা ‘থাক বস্ত ম্যাপ’ নামে চিহ্নিত যার সবগুলিই ১৮৫৫ সালের। এছাড়া রয়েছে
রাজস্ব সংগ্রহ সংক্রান্ত আজস্র ফাইল, পুলিস রেকর্ড, রেল ও কয়লাখনি সংক্রান্ত অসংখ্য দলিল। ইতিহাসের ছাত্র, গবেষকরা এই
মহাফেজখানাটি গবেষণার স্বার্থে ব্যবহার করলে বিশেষ উপকৃত হবেন বলেই আমার ধারণা।
মহাফেজখানাটির
রক্ষণাবেক্ষণে জেলা প্রশাসনকে একটু যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। মহাফেজখানা বাড়িটি
সংরক্ষিত নথিপত্রের তুলনায় ছোট এবং পরিকাঠামোও পুরোন নথিপত্র রাখার উপযুক্ত নয়।
জেলা প্রশাসনের উচিত এব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া। প্রশাসনের পক্ষ থেকে
তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক নথিগুলি ডিজিটাইজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সেই
উদ্যোগেও যথেষ্ট খামতি রয়েছে। পুরোন নথিগুলিকে নষ্ট না করে ডিজিটাইজ করার পদ্ধতি
এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে না যা সহজেই করা যায় ওভারহেড স্ক্যানার বা ডি. এস. এল.
আর ক্যামেরার সাহায্যে।
এছাড়াও
বর্ধমান জেলা ভাগের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এই মহাফেজখানাটি উপরও
অবশ্যম্ভাবীরূপে এসে পড়বে। ইতিমধ্যেই মহাফেজখানার কর্মীদের মধ্যে নথিপত্র ভাগের
তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। এই ভাগাভাগীর চক্করে শতাব্দী প্রাচীন ভঙ্গুর নথিপত্রগুলির
যে কি অবস্থা হবে তা ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি। জেলা প্রশাসনের উচিৎ অবিলম্বে মহাফেজখানার
নথিপত্রগুলি আর্কাইভের মানদন্ড অনুযায়ী সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী
সংরক্ষণের স্বার্থে সেগুলি ডিজিটাইজ করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা। আর মহাফেজখানার
পুরোন নথিপত্রের একটি স্যারোগেট কপি তুলে দেওয়া পশ্চিম বর্ধমানের নতুন জেলা
প্রশাসনের হাতে যাতে তারাও প্রয়োজনে সেই নথিপত্রগুলি ব্যবহার করতে পারে আসল
নথিপত্রগুলি নাড়াচাড়া না করেই। সেই
সঙ্গে নতুন গড়ে তোলা ডিজিটাল আর্কাইভটি উন্মুক্ত করা হোক গবেষকদের কাছে যা জেলার
ইতিহাস চর্চাকে সমৃদ্ধ করবে।
No comments:
Post a Comment