Tuesday, 13 March 2018

ইস্কোর বর্জ্য দিয়ে তৈরী হল শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে মনোরম পার্ক



সময়টা ষাটের দশকের শুরু। আসানসোল শিল্পাঞ্চল তখন খ্যাতির মধ্যগগণে। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পর্বে ভারী শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ছাপ তখন এই অঞ্চলের সর্বত্র বিরাজমান। দুর্গাপুর থেকে চিত্তরঞ্জন পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পাঞ্চলে যে কর্মযোগ্য শুরু হয় তা পরিচালিত হতে থাকে আসানসোল থেকে। এই সময়ই আসানসোলের মহকুমা শাসক হয়ে কাজে যোগ দেন এক তরুণ দক্ষিণী প্রশাসক, কে. সি. শিবরামকৃষ্ণান (১৯৩৫-২০১৫)। ১৯৫৮ ব্যাচের এই আই.এ.এস অফিসার  পরবর্তীকালে নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নগর চর্চা বিশারদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সি.এম.ডি.এ এর প্রথম মুখ্যসচিব সহ রাজ্য ও কেন্দ্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি কাজ করেছেন। নগরায়ন নিয়ে তাঁর লেখা ও সম্পাদনা করা বইগুলি নগর প্রসাশক ও নগরায়ন নিয়ে চর্চা করা ছাত্র ও গবেষকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। শিবরামকৃষ্ণানের প্রশাসকজীবন বা তাঁর নগর ও নগরায়ন চর্চার মূল্যায়ন কারা আমার পক্ষে নিতান্তই অনধিকার চর্চা হবে এবং এই লেখার উদ্দেশ্যও তা নয়। গুরুগম্ভীর লেখাপত্রের বাইরে তিনি একটি অসাধারণ স্মৃতিচারণা আমাদের উপহার দিয়েছেন যার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তৎকালীন আসানসোল-বার্ণপুরের সমাজজীবনের এক মজাদার কোলাজ।

The Enduring Babu: Memoirs of a Civil Servant বইটি হঠাৎ করেই একদিন নজরে আসে। সিভিল সার্ভেন্টদের লেখা স্মৃতিচারণ সচরাচর তাঁদের কর্মজীবনের মতই গুরুগম্ভীর ও অনুশাসনে মোড়া হয়ে থাকে। অন্নদাশংকর রায়ের বিনুর ডায়েরী, যুক্তবঙ্গের স্মৃতি, মুক্তবঙ্গের স্মৃতি  কিম্বা  অশোক মিত্রের তিন কুডি দশ সেই সময়ের মুল্যবান দলিল হিসাবে স্বীকৃত। শিবরামকৃষ্ণানের স্মৃতিচারণা একেবারে অন্য ঘরাণার লেখা। সিভিল সার্ভেন্টসুলভ গাম্ভীর্যের খোলশ ছেড়ে তিনি এমন কিছু মজাদার ঘটনা তুলে এনেছেন তাঁর স্মৃতির মণিকোঠা থেকে যা সেই সময়কে নতুন করে চিনতে আমাদের সাহায্য করে

১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানায় দেশের প্রথম ইলেকট্রিক রেল ইঞ্জিন, ‘লোকমান্য’র উদ্বোধন করতে আসেন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু, সঙ্গে বোন বিজয়লক্ষ্মী। সেই উপলক্ষ্য উপস্থিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধান চন্দ্র রায়ও। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে নির্ধিধায় ‘জহরলাল’ সম্বোধন করতে অভ্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের শিল্প মনচিত্রে আবার সামনের সারিতে ফিরিয়ে আনতে তিনি বদ্ধপরিকর। সেকারনে কয়লা নিয়ে কেন্দ্রের মাসুল সমীকরণ নীতির তিনি তীব্র সমালোচক। প্রধানমন্ত্রীকে সামনে পেয়ে তিনি উচ্চকণ্ঠে তাঁর আপত্তির কথা জানান। “জহরলাল, তোমরা যদি এই নীতি  নিয়ে চল তাহলে রাজ্যগুলো কিন্তু বিদ্রোহ করবে”। জহরলাল তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। “ ডাক্তার সাব্‌, ডাক্তার সাব্‌, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন”। সন্ধ্যায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর বিধান চন্দ্র রায় দুর্গাপুর রওনা হবেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অনুরোধ করেন রাতের খাবার খেয়ে যেতে। কিন্তু তিনি রাজী নন। বিজয়লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমার ভাই এখানে ছুটিতে এসেছে, কিন্তু আমার কাজ আছে। চিত্তরঞ্জনে বাকী সময়টা উপভোগ কর”। এই বলে তিনি গাড়িতে উঠলেন।

সেই রাত্রেই শিবরামকৃষ্ণান বিধান চন্দ্র রায়ের আর এক রূপ দেখলেন। দুর্গাপুরের সরকারী অতিথিশালায় পৌঁছেই মুখ্যমন্ত্রী কাজে ডুবে যান। বেশ কয়েকজন শিল্পপতি আগে থেকেই লাউঞ্জে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। শিবরামকৃষ্ণান তাঁর জন্য নির্দিষ্ট ঘরে যান। ঘন্টাখানেক পরই তাঁর ডাক পরে। তাড়াতাড়ি লাউঞ্জে ফিরে দেখেন আলোচনা তখনও চলছে। তাঁকে দেখেই মুখ্যমন্ত্রী জিজ্ঞেস করেন খাওয়া হয়েছে কিনা। হয়নি শুনেই অতিথিশালার রাধুনি পিতাম্বরকে নির্দেশ দেন তাড়াতাড়ি মাছের ঝোল ও ভাত এনে দিতে। পিতাম্বর চলে যেতে শিবরামকৃষ্ণান একটু সাহস সঞ্চয় করে বলেন,
    “কিন্তু স্যার, আমি তো নিরামিষাশী...”
       “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি তোমরা দক্ষিণ ভারতীয়রা সব নিরামিষাশী”
       “কিন্তু স্যার, আমি তো মাছ খাই না...”
       “কেন? মাছ খাও না কেন? কি হয়েছে তোমার? তাহলে খাবে কি?
এমনটাই ছিলেন সেসময় দেশের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ্যমন্ত্রী, ড. বিধান চন্দ্র রায়। দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি নীতির প্রশ্নে তিনি যতটাই কঠোর হন না কেন একজন নবীন দক্ষিনী সিভিস সার্ভেণ্টের প্রতি ততটাই যত্নশীল অভিভাবকের মত।  

শিবরামকৃষ্ণানের স্মৃতিচারণা থেকে আর একটি অন্য ধরণের গল্প বলে এই লেখা শেষ করব। সেসময় বার্ণপুর ছিল যথার্থ অর্থেই একটি পরিকল্পিত ইস্পাতনগরী। একদিকে কারখানা, অন্য দিকে সারি সারি কোয়ার্টার ও প্রশস্ত বাংলো। সেসময় বার্ণপুরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তার ক্লাবটি যা আসানসোল ক্লাবের মত সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। ক্লাবে প্রবেশাধিকার ছিল কেবলমাত্র ইস্পাত কারখানা ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারখানার কর্মচারী ও আমন্ত্রিত সদস্যদের। স্যার বীরেন মুখার্জীর নেতৃত্বে ইস্কো কারখানার তখন রমরমা অবস্থা। যদিও  স্যার বীরেন মুখার্জী ও তাঁর স্বনামধন্যা স্ত্রী, লেডি রানু মুখার্জী বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেই কেবলমাত্র বার্ণপুরে আসতেন। কারখানার দায়িত্ব সামলাতেন মূলতঃ দুজন বিদেশী  — স্কটিশ প্রযুক্তিবিদ মি. ম্যাকক্রাকেন এবং জার্মান প্রযুক্তিবিদ মি. লামেয়ার। আর বার্ণপুরের সমাজ পরিচালিত হত কয়েকজন ফ্যাশানদুরস্ত আধুনিক মহিলার দ্বারা। এঁদের স্বামীরা যত দক্ষ প্রযুক্তিবিদই হোন না কেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন স্ত্রীদের হাতের পুতুল। এই মহিলাদের স্ব স্ব গোষ্ঠি ছিল এবং প্রায়ই তাঁরা বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন একে অপরকে টেক্কা দেবার জন্য। এই সব সান্ধ্য অনুষ্ঠানে সকলেই প্রায় উপস্থিত থাকলেও মি. লামেয়ারকে কখনই দেখা যেতনা। শোনা যেত তিনি সেসময় নিকটবর্তী দামোদরের তীরে কি একটা কাজে ব্যস্ত থাকেন। কিছুদিন পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। একদিন তিনি সবাই চমকে দিয়ে ঘোষণা করলেন যে দামোদরে ধারে একটি সুন্দর জিনিস তৈরী হয়েছে, সবাই যেন সময় করে দেখে আসেন। নিঃসঙ্গ জার্মান প্রযুক্তিবিদের কয়েক বছরের পরিশ্রমের ফসল হিসাবে দামোদরের ধারে ততদিনে তৈরী হয়ে গেছে এক মনোরম পার্ক। মূলতঃ ইস্কো কারখানার বাতিল জিনিস ও বর্জ্য পদার্থ দিয়ে তিনি তৈরী করেন তাঁর এই স্বপ্নের পার্ক। ব্লাস্ট ফার্নেসের ছাই ফেলে তৈরী হয় রাস্তা, পুরোনো পোড়া ইঁট দিয়ে তৈরী হয় দেওয়াল এবং ফার্নেসের বাতিল টিউব সারিয়ে বানানো হয় জলের লাইন। কয়েকমাসের মধ্যে পার্কটি এই অঞ্চলের একটি দ্রষ্টব্য স্থানে পরিণত হয়। পার্কটি তার স্রষ্টার নামে পরিচিত হয়। পরে যদিও তার নাম পরিবর্তন করে ‘নেহেরু পার্ক’ করা হয়, কিন্তু শিল্পাঞ্চলের মানুষ এখনও তাদের প্রিয় পার্কটিকে ‘লামেয়ার পার্ক’ নামে ডাকতেই বেশী ভালোবাসে।
  
এই রকম অনেক মজাদার গল্পে ভরপুর শিবরামকৃষ্ণানের স্মৃতিচারণাটি।  

ঋণ স্বীকারঃ
K.C.Sivaramakrishnan, The Enduring Babu: Memoirs of a Civil Servant, New Delhi, Har-Anand, 2009                                        

No comments:

Post a Comment

উচ্চশিক্ষায় টি-টোয়েন্টিসুলভ তাণ্ডবলীলা

সম্প্রতি জেলার ও রাজ্যের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অকৃতকার্যতার অস্বাভাবিক হার বৃদ্ধি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের মাথাব্...